মা মৃণালিনী শীল আশায় ছিলেন, চিকিৎসাধীন ছেলে রক্তিমের জ্ঞান ফিরবে। সুস্থ হয়ে তিনি পরিবারের হাল ধরবেন। এ জন্য স্বজনদের নিয়ে অনেক প্রার্থনা করেছেন। কিছুতেই ফিরলেন না রক্তিম।

১৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল মঙ্গলবার মারা যান তিনি। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটির হাল ধরার তেমন কেউই রইল না। রক্তিমের মা ও স্ত্রীর মধ্যে ফুটে উঠেছে অসহায়ত্ব।

৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে বাবা সুরেশ চন্দ্র শীলের শ্রাদ্ধকর্ম সেরে বাড়ি ফিরছিলেন রক্তিমসহ তাঁর আট ছেলে-মেয়ে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়ার হাসিনাপাড়ার কাছে তাঁদের চাপা দেয় সবজিবোঝাই দ্রুতগতির একটি পিকআপ। দুর্ঘটনাস্থলে চার ভাই অনুপম, নিরুপম, চম্পক, দীপক মারা যান। হাসপাতালে মারা যান আরেক ভাই স্মরণ। তখন থেকেই অচেতন অবস্থায় চিকিৎসাধীন ছিলেন রক্তিম।

সর্বশেষ চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলেন তিনি। সেখানেই গতকাল সকাল ১০টার দিকে মারা যান। ৮ ফেব্রুয়ারির দুর্ঘটনায় রক্তিমের সঙ্গে আহত হয়েছিলেন আরেক ভাই প্লাবন ও বোন হীরা। দুর্ঘটনার পর থেকে প্লাবন অনেকটা ভারসাম্যহীন। অচেনা কাউকে দেখলেই তেড়ে যান। চকরিয়ার মালুমঘাট মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতালে এখনো চিকিৎসাধীন হীরা।

রক্তিমের স্ত্রী সুমনা শর্মার বড় ভাই মিন্টু দত্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, পাঁচ ভাইয়ের মৃত্যুর পর পরিবারটির হাল ধরার শেষ আশ্রয় ছিলেন রক্তিম। তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন—এই আশায় পুরো পরিবার তাকিয়ে ছিল। এখন তাঁর মৃত্যুতে চোখে অন্ধকার দেখছে বৃহৎ ওই পরিবার। দুই বেলা খাবার জোগাড় কিভাবে হবে, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার ভবিষ্যৎই বা কোন দিকে—এসব চিন্তা করলেই ভেঙে পড়ছেন বৃদ্ধা মা ও বিধবা নারীরা।

দুপুরে রক্তিমদের হাসিনাপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীহারা পাঁচ নারী উঠানে সন্তানদের নিয়ে বসা। ক্ষণে ক্ষণে তাঁরা চিৎকার করে কাঁদছিলেন।

বাড়ির ভেতরে অন্ধকার একটি কক্ষে বিছানায় মা মৃণালিনী। ‘মা’ বলে ডাকতেই ডুকরে ওঠেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘ভগবান, তুমি এত নিষ্ঠুর কেন? পাঁচ সন্তানকে কেড়ে নিয়েছিলে। রক্তিমকে কি বাঁচিয়ে রাখা যেত না? এখন আমি কার মুখ দেখে দুনিয়ায় বেঁচে থাকব? আমার তো আর কিছুই রইল না। ’

রক্তিমের স্ত্রী সুমনা বলেন, ‘আমিও শেষ হয়ে গেলাম। ভগবান আমার স্বামীকেও নিয়ে গেলেন। আমার ছোট্ট শিশু ঋদ্ধিও বাবাকে হারিয়ে ফেলল। এখন আমরা কী নিয়ে বাঁচব?’

দুর্ঘটনা থেকে অক্ষত অবস্থা বেঁচে যাওয়া রক্তিমের আরেক বোন মুন্নী শীল বলেন, ‘আমার এই ভাইকেও রক্ষা করতে পারলাম না। আমরা পিকআপের চালক, মালিকসহ সেই দিন গাড়িতে যারা ছিল তাদের সবার ফাঁসি চাই। ’

চকরিয়া থানার ওসি মুহাম্মদ ওসমান গনি গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘সাত ভাইয়ের মধ্যে বেঁচে আছেন শুধু প্লাবন শীল। ভাইদের মৃত্যুতে তিনি অনেকটাই ভারসাম্যহীন। বাড়িতে আর কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় রক্তিমের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সহায়তা করতে এসেছি। ’

kalerkantho

১৪ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গতকাল মারা যান রক্তিম। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারটির হাল ধরার তেমন কেউই রইল না। রক্তিমের মা ও বোনের চোখে ফুটে উঠেছে অসহায়ত্ব। ছবি -কালের কণ্ঠ 

অনিশ্চয়তায় পরিবার

পরিবার সূত্র জানায়, পিকআপের চাপায় প্রাণ হারানো ছয় ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় নিরুপমের কোনো সন্তান নেই। তাঁর স্ত্রীর নাম গীতা। অন্য পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে অনুপমের পরিবারে স্ত্রী পপি এবং দুই সন্তান দেবশ্রী (১৬) ও অর্ক (১১)। দীপকের পরিবারে স্ত্রী মুন্নী ও একমাত্র ছেলে আয়ুষ্মান (৬), চম্পকের পরিবারে স্ত্রী দেবিকা এবং দুই কন্যা আয়ুশ্রী (৪) ও আদ্রিতা (১৮ মাস), স্মরণের পরিবারে স্ত্রী তৃষ্ণা এবং দুই সন্তান অভি (৫) ও এক মাস বয়সের শিশু শ্রীময়ী। রক্তিমের একমাত্র ছেলে ঋদ্ধি। তিন বছর আগে হৃদরোগে মারা যান আরেক ভাই হীরক। তাঁর দুই স্ত্রী শিল্পী ও সাকী। তাঁদের দুই কন্যা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া চন্দ্রিকা শীল তুর্কী এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া অনুষ্কা শীল পর্না। ছেলে অংকুশের বয়স তিন বছর।

শিল্পী কালের কণ্ঠকে জানান, স্বামী মারা যাওয়ার পর দেবররাই তাঁদের সংসার দেখাশোনাসহ তিন ছেলে-মেয়ের ভরণপোষণ করে আসছিলেন। তিনি বলেন, ‘আজ তারাও দুনিয়াতে নেই। এখন আমরা কিভাবে বাঁচব, সন্তানদের নিয়ে ভবিষ্যতে কোথায় যাব, সেই ভরসা দেওয়ারও কেউ নেই। ’

Leave a Reply

Your email address will not be published.