ছোটবেলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার আগ্রহ ছিল। সেই সুযোগ না হলেও একটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করার সুযোগ পান ড. একেএম সাইদ হাসান। এতে আংশিক স্বপ্ন পূরণ হয় তার। স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে আজ তিনি উঠে এসেছেন অনন্য উচ্চতায়। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে কলেজ পর্যায়ে দেশের শ্রেষ্ঠ শ্রেণি শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

ড. একেএম সাইদ হাসান সাভার সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

বুধবার ২২ জুন বিকেলে দেশসেরা এই শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয় ঢাকা পোস্টের। তিনি দেশসেরা শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে ঢাকা পোস্টকে তার অনুভূতির কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। এ কারণে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছি। আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদ বিদ্যায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করি। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুযোগ হয়নি।

পরে ১৯৯৬ সালের ২ মার্চ সাভার সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। আজ আমি দেশসেরা শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছি। এটি অবশ্যই ভালো লাগার ব্যাপার।

তিনি বলেন, আমি ভাবতেই পারছি না যে আজ আমি দেশসেরা শিক্ষক। তিনি বলেন, শিক্ষকতা করতে হলে অবশ্যই দরদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করতে হবে।

ভেতর থেকে দরদ দিয়ে পড়াতে হবে। কমার্সিয়ালি কোনোভাবেই পাঠদান করা যাবে না। আমার শিক্ষার্থীরা আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবে। শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টরের মাধ্যমে ডিজিটাল যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠদান করে যাচ্ছি। আমার যে দায়িত্ব সেটা আমি পালন করার চেষ্টা করেছি।

তিনি আরও বলেন, চিন্তা করতে হবে সৃষ্টিকর্তা টিচার বানিয়েছেন। টিচার হিসেবে আমার কতটুকু দায়িত্ব! আমি প্রজেক্টর ব্যবহার করে পাঠ দান করেছি যা খুব কম শিক্ষকই করছেন। আমার প্রায় ২৬টি পাবলিকেশন্স। যার মধ্যে একটি বই রয়েছে যে বইটি জার্মানি থেকে প্রকাশ করা।

শিক্ষা জীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, শিক্ষা জীবন ভালোভাবেই পার করেছি। কোনো কিছুর অভাব ছিল না। বাবা সরকারি ডাক্তার ছিলেন। সেই কারণে তিনি ছেলেকে ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলেন। মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু হয়নি। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালযয়ে ভর্তি হই। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া দরকার ছিল তা বুঝে উঠতে পারিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভালো লেগেছিল তাই সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অনেক সুন্দর, সেই সুন্দরের মায়ায় পড়ে গিয়েছিলাম।

অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, আমি কখনোই ভাবিনি’ যে আমি দেশসেরা হবো। রেজাল্ট দেওয়ার আগ পর্যন্ত আমি এটা কল্পনাও করিনি। কাগজপত্র ফাইল সব গাড়িতে রেখে এসেছিলাম। আমার কিছু পেপারস জমা দিইনি। ভেবেছিলাম আর মনে হয় হবো না। যে কারণে এগুলো লাগবে না, তাই গাড়িতে রেখে এসেছিলাম। কিন্তু একজন টিচারের অনুরোধে ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। যখন আমাকে সেরা ঘোষণা করা হলো তখনও আমি ক্ষণিকের জন্য বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। এটা ছিল এক অন্যরকম অনুভূতি।

ড. একেএম সাইদ হাসান বলেন, আমি গতকাল রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ-২০২২ এর জাতীয় পর্যায়ের সেরা শ্রেণি শিক্ষকের পুরস্কার নিয়েছি। এটা সত্যিই একটা স্মরণীয় দিন। এমন দিন সব শিক্ষকদের জীবনে আসুক এটা কামনা করি।

দেশের শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, সব সময়ই পাঠদান করতে হবে দরদ দিয়ে। কিছু শিক্ষিত ও উন্নতমানের শিক্ষক কিন্তু অনেক জানেন। কিন্তু কৌশলগত কারণে ঠিকমতো পাঠ দান করতে পারেন না। অনেক শিক্ষক আবার কমার্শিয়ালি পাঠ দান করেন। এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। শিক্ষকতা পেশা কমার্শিয়ালি নেওয়া যাবে না। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাঠ দান করতে হবে। তাহলেই একজন শিক্ষক প্রকৃত শিক্ষক হবেন। হবেন দেশসেরাও।

সাভার সরকারি কলেজের প্রিন্সিপাল প্রফেসর মো. ইমরুল হাসান বলেন, আমাদের কলেজের একজন শিক্ষক দেশসেরা নির্বাচিত হয়েছেন, এটা শুধু আমাদের কলেজের সুনাম বয়ে আনেনি বরং সারা দেশের সুনাম তিনি কুড়িয়েছেন। আমরা আমাদের কলেজে এমন একজন শিক্ষক পেয়ে গর্বিত।

প্রসঙ্গত, সেরা শিক্ষক নির্বাচনে প্রথমে কলেজ থেকে একটি কমিটি করা হয়। সেই কমিটি যাচাই বাছাই করে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচন করে উপজেলায় পাঠায়। সেখানে বিভিন্ন কলেজ থেকে আসা শিক্ষকদের মধ্য থেকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়ে জেলা পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ায় বিভাগীয় পর্যায়ে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে দেশের ৮টি বিভাগ থেকে ৮ জন এবং ঢাকা মহানগরকে একটি বিভাগ ধরে ১ জনসহ ৯ জনের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। সেখানে বিভিন্ন বিষয় যাচাই বাছাই করে ড. একেএম সাইদ হাসানকে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.