রাজধানীর উত্তরা থেকে সোমবার সন্ধ্যায় কারওয়ান বাজারে ইলিশ কিনতে এসেছিলেন মিজান গাজী নামে এক যুবক। সঙ্গে ছিলেন তার এক চীনা বন্ধু। বাজারে ঘণ্টাখানেক ঘুরে ৫ জোড়া ইলিশ কিনলেন।

একটি ইলিশ কিনলেন আলাদা। সেটির ওজন ২ কেজি ৩৫ গ্রাম। দাম ছয় হাজার টাকা।

মিজান গাজী চীনে থাকেন। তিনি বলেন, ‘ইলিশ আমার প্রিয় মাছ। চীনে পাওয়া যায়। কিন্তু দেশীয় ইলিশের এই স্বাদ নেই। ছয় হাজার টাকায় মাছটি কিনে বিক্রেতাকে ২০০ টাকা বকশিশ দিলাম।’

মিজান গাজী চলে যেতেই পাশে থাকা ব্যাংক কর্মচারী মিনহাজ বললেন, এরা বড় লোক, টাকা আছে, ডজন ডজন ইলিশ কিনতে পারে। দাম এদের কাছে মামুলি ব্যাপার।

বাজার ঘুরে আরও কয়েকজন ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে মিনহাজের কথারই প্রমাণ পাওয়া গেল। বিক্রেতাদের ঢালা ভরা ইলিশ, কিন্তু দামে আগুন। বাজারে বেশিরভাগ ক্রেতারই তা নাগালের বাইরে।
ইলিশ

রোববার ভোরে যাত্রাবাড়ী পাইকারি মাছ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি ইলিশের ঝুড়ি। বিক্রেতারা জানান, এখান থেকেই খুচরা বিক্রেতারা ইলিশ মাছ কিনে বাজারে বিক্রি করেন। তাছাড়া এক শ্রেণির ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আছে, যারা এ বাজার থেকেই মাছ কিনে বিভিন্ন মহল্লায় বিক্রি

করেন। ভোলা মৎস্য ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মিলন মিয়া জানান, পাইকারি ইলিশের দাম খুব একটা নড়চড় হয় না। তবে যারা খুচরায় কিনতে আসেন, তাদের কাছ থেকে দাম বেশি রাখা হয়। কারণ, তারা বেছে বেছে মাছ কিনেন। খুচরা পর্যায়ে ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ৭৫০ থেকে ১১০০ টাকায় বিক্রি হয়। ১ কেজি ১০০-২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয় ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায়।

রামপুরা কাঁচাবাজারে মাছ কিনতে আসা বিমল রায় আক্ষেপ করে বলেন, বাজারে এখন সব জিনিসের দাম চড়া। ইলিশে সয়লাব বাজার, কিন্তু এর ধারেই যাওয়া যাচ্ছে না। ইলিশের বদলে চাষের মাছ কিনতে গিয়েও আমাদের মতো স্বল্প আয়ের মানুষের পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।

ইলিশের সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও দাম বেশি কেন জানতে চাইলে এক বিক্রেতা বলেন, বেশি দামে কিনতে হয় বলেই বেশি দামে বিক্রি করি। তাছাড়া ইলিশের ব্যবসা করতে হলে পুঁজিটা বেশি লাগে। বেশি টাকা খাটিয়ে কম লাভ করলে কি করে হয়।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছরই বাড়ছে। গত অর্থবছরে ৫.৬৫ লাখ টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে। চলতি বছর এর পরিমাণ ৬ লাখ টন ছাড়াবে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ শাখার প্রধান কর্মকর্তা মাসুদা আরা মমি বলেন, উৎপাদন বাড়লেও ইলিশের দাম যতটুকু কমার তা কমছে না। আবার দেখা যায়, একই সাইজের ইলিশ একেক বাজারে ভিন্ন ভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া তরতাজা ইলিশের দাম ও বরফে রাখা ইলিশের দামেও হেরফের হয়।

তিনি বলেন, ইলিশের দাম নিয়ন্ত্রণে না থাকায় সাধারণ মানুষ যথাযথভাবে ইলিশ কিনতে পারে না। তাই বাজার মনিটরিং জোরদার করা জরুরি। এতে সাধারণ মানুষ কম দামে ইলিশ কিনতে পারবে।

নদী ও সাগরের ইলিশ : মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, ইলিশের প্রকত ঘর সাগরে। ডিম ছাড়ার সময় নদীতে আসে। নদীর ইলিশ কিছুটা বেঁটে হয়, সাগরের ইলিশ সরু ও লম্বা। পদ্মা ও মেঘনার ইলিশ বেশি উজ্জ্বল হয়। দেখতে রুপালি রঙের। সাগরের ইলিশে উজ্জ্বলতা বা রুপালি ভাব থাকে না।

ইলিশের যত উপকার : ইলিশের স্বাদ যেমন বেশি তেমনি উপকারও। মৎস্যবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইলিশে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক ও পাটাশিয়াম। ইলিশ খেলে হৃদযন্ত্র ভালো থাকে, মস্তিষ্কের গঠন ভালো হয়,

রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকে। এ ছাড়া ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডারও কম হয়। ইলিশের এমন বিশেষ গুণগুলো সুবিধাবঞ্চিত কিংবা নিম্ম-মধ্যবিত্ত মানুষ খুব একটা জানে না। আবার জানলেও দাম বেশি হওয়ায় ক্রয় করতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.